পঞ্চম খণ্ড :পর্ব- ১
কমলিকা ভট্টাচার্য
স্মৃতির ব্যাকআপ
অসংখ্য বিপদ, বিশ্বাসঘাতকতা, উদ্ধার–অভিযান আর প্রযুক্তির সীমা পরীক্ষা করতে করতে অনির্বাণ, নাতাশা, ইরা ও ঋদ্ধিমান এমন এক বাস্তবে এসে দাঁড়িয়েছিল, যেখানে মানুষ ও হিউম্যানয়েডের বিভাজনরেখা ক্রমশ অস্পষ্ট হয়ে যায়। নাতাশার দীর্ঘ কোমায় তলিয়ে যাওয়া আর সেই সময়েই আদরের জন্ম—এক অলৌকিক আশার মতো। সেখানেই শেষ হয়েছিল আগের খণ্ড।
আদরের বয়স তখন মাত্র সাত মাস। ভালো নাম আদর্শ,সবার আদরের তাই আদর।
ঘরের ভেতর নরম আলো। জানালার পর্দা অর্ধেক নামানো—সূর্যের আলো ঢুকছে ছেঁকে, যেন সময় নিজেই ধীরে হাঁটছে। সেই আলোর রেখা এসে পড়ে নাতাশার মুখে। চোখ দুটো বন্ধ, শ্বাসপ্রশ্বাস নিয়মিত, কিন্তু সেই মুখে অদ্ভুত এক সজাগতা—যেন সে ঘুমিয়েও জেগে আছে।
🍂
বিছানার পাশে বসে অনির্বাণ চুপচাপ তাকিয়ে থাকে। এই নীরবতা তার সহ্য হয় না। যুদ্ধ, বিপর্যয়, বিপজ্জনক মিশন—সবকিছুর মধ্যে সে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, কাজ করেছে, এগিয়েছে। কিন্তু এই অপেক্ষা—এই স্থিরতা—তাকে ভিতর থেকে ভেঙে দেয়।
অন্যদিকে ইরা মেঝেতে বসে আদরকে নিয়ে খেলছে। ছোট্ট কাঠের ব্লক, নরম কাপড়ের বল, একটা টিনের ঘণ্টি। আদর মৃদু শব্দ করে হাসছে। তার চোখে অদ্ভুত উজ্জ্বলতা। বয়সের তুলনায় সেই দৃষ্টি খুব গভীর।
ঋদ্ধিমান দূরে দাঁড়িয়ে তাকিয়ে ছিল। হঠাৎ বলল, “ওর চোখে লক্ষ্য করেছ?”
ইরা হেসে বলল, “সব বাচ্চার চোখেই তো কৌতূহল থাকে।”
ঋদ্ধিমান ধীরে মাথা নাড়ল, “না। এটা কৌতূহল নয়। এটা পর্যবেক্ষণ।”
অনির্বাণ চুপ করে শুনছিল। সে জানে ঋদ্ধিমান অকারণে কিছু বলে না।
আদর খেলতে খেলতে ব্লকগুলো এমনভাবে সাজাচ্ছিল, যেন এলোমেলো নয়—একটা নির্দিষ্ট প্যাটার্নে। প্রথমে তিনটা, তারপর দুটো, তারপর আবার তিনটা। ঋদ্ধিমান এগিয়ে গিয়ে ব্লকগুলো একটু বদলে দিল। আদর কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল, তারপর আবার আগের প্যাটার্নে সাজিয়ে দিল।
ইরা অবাক হয়ে বলল, “ও এটা শিখল কী করে?”
ঋদ্ধিমান তখন গভীরভাবে চিন্তায় ডুবে গেছে। তার মেমোরি ব্যাংকের ভেতর কোথাও একটা পুরোনো ফাইল নড়েচড়ে উঠেছে। খুব ধীরে সে বলল—“Timson…”
অনির্বাণ তাকাল, “কী?”
ঋদ্ধিমান বলল, “আমি Mr. Timson-এর নিউরাল ব্যাকআপ রেখেছিলাম। বছর খানেক আগে। পরীক্ষার জন্য। কখনো ব্যবহার করিনি।”
ঘরটা হঠাৎ ভারী হয়ে উঠল। ইরা ফিসফিস করে বলল, “মৃত মানুষের নিউরাল স্মৃতি ব্যবহার করবে?”
ঋদ্ধিমান চুপ করে রইল। প্রযুক্তি পারে—কিন্তু করা উচিত কি?
অনির্বাণ ধীরে বলল, “যদি সেটা আমাদের আদরকে বুঝতে সাহায্য করে?”
নীরবতা। নাতাশার চোখের পাতা সামান্য কেঁপে উঠল—কেউ খেয়াল করল না।
ঋদ্ধিমান ল্যাবে ঢুকল। ধুলো জমে থাকা পুরোনো সার্ভার ইউনিট চালু করল। স্ক্রিনে ভেসে উঠল—
TIMSON_NEURAL_ARCHIVE.v3
সে খুব আস্তে বলল, “ক্ষমা করবেন, স্যার।”
ফাইল খুলতেই স্ক্রিনে জটিল নিউরাল ম্যাপ ভেসে উঠল। মানুষের মস্তিষ্কের চিন্তার রেখা, স্মৃতির স্তর, প্রতিক্রিয়ার গতি—সব রেকর্ড করা। ঋদ্ধিমান আদরের সাম্প্রতিক নিউরাল রেসপন্স ডাটা পাশাপাশি রাখল।
কয়েক সেকেন্ডের বিশ্লেষণের পর সে স্থির হয়ে গেল। “অসম্ভব…”
অনির্বাণ এগিয়ে এল, “কি দেখছ?”
ঋদ্ধিমান স্ক্রিনের দিকে দেখাল, “এই প্যাটার্নটা দেখো। Timson-এর মস্তিষ্কে ছিল। Rare cognitive bridge pattern—মানুষ আর হিউম্যানয়েড নিউরাল সিঙ্কের সম্ভাবনা তৈরি করতেন তিনি ,এই ছিল তার গবেষণা।”
ইরা স্তব্ধ।
ঋদ্ধিমান ধীরে বলল, “আদরের মস্তিষ্কে একই প্যাটার্ন তৈরি হচ্ছে। জন্মগতভাবে।”
ঘরের বাতাস যেন থেমে গেল। অনির্বাণ ফিসফিস করে বলল, “মানে?”
ঋদ্ধিমান তাকাল, “এই শিশু একটা সেতু।”
ঠিক তখনই নাতাশার চোখের কোণ দিয়ে একটি অশ্রুবিন্দু গড়িয়ে পড়ল।
ঋদ্ধিমান বুঝল—এটা শুধু বুদ্ধিমত্তা নয়, এক বিরল নিউরাল গঠন। ইরা আদরকে কোলে তুলে নিল। তার বুকের ভেতর কাঁপুনি। “আমরা কি ওকে বিপদের মধ্যে ফেলছি?”
অনির্বাণ দৃঢ় গলায় বলল, “না। আমরা ওকে রক্ষা করব।”
সিদ্ধান্ত হলো—এই সত্য কেউ জানবে না।
সন্ধ্যা নামল। তারা ফিরে দেখে নাতাশার গাল ভেজা। অনির্বাণ তার হাত ধরে বলল, “তুমি শুনতে পাচ্ছ, তাই না?” আঙুলের ডগা সামান্য নড়ল।
ঋদ্ধিমান ফিসফিস করল, “ও সব জানে।”
আদর মায়ের দিকে তাকিয়ে চুপ করে থাকে—যেন বুঝতে পারছে, এই নীরব দেহের ভেতরেও এক জেগে থাকা চেতনা আছে।
সেই রাতে তারা তিনজন আদরের পাশে বসে রইল। কেউ কথা বলল না। কিন্তু প্রত্যেকে জানল—আজ তারা এমন এক সত্যের সামনে দাঁড়িয়েছে, যা তাদের জীবন বদলে দেবে।
এই শিশুকে শুধু বড় করা নয়, রক্ষা করতে হবে। শুধু ভালোবাসা নয়, গোপন রাখতে হবে।
কারণ সে কেবল একটি শিশু নয়—সে ভবিষ্যতের সম্ভাবনা।
আর নাতাশা, নিঃশব্দ শয্যায় শুয়ে, চোখের কোণে অশ্রু নিয়ে অনুভব করল—
বাঁচার উত্তরাধিকার সত্যিই শুরু হয়ে গেছে।
1 Comments
নতুন দিন নতুন সৃষ্টি কাহিনী আবহমান। লিখে যান। আমরা পড়তে পড়তে ভাবি। ভাবতে ভাবতে পড়ি। 🙏
ReplyDelete