বাংলার ঘাস পাতা ফুল ফল, পর্ব - ১২২
সাগরলতা
ভাস্করব্রত পতি
'ফেনিল জোয়ারে আশাগুলো ভাসে
অধরে মুচকি হাসি,
কানে কানে এসে বলে গেলো কেউ
খুব বেশি ভালোবাসি।
সেই সুখে হাসে সাগরলতারা
হেসে হয় পরবাসী,
যদি ডাকে কানু রাধা রাধা বলে
প্রেম পরবেই ফাঁসি।'
সাগরপাড়ে গেলে বালুরাশির ওপরে ভালোবাসার চাদরে ঢেকে রাখা সবুজ গালিচার মতো যে লতানো কার্পেট উদ্ভিদ আমরা দেখতে পাই, সেটাই কবি বর্ণিত 'সাগরলতা'। দীঘা থেকে ফ্লোরিডা, কক্সবাজার থেকে হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জ - সাগরলতার গালিচায় পরিপুষ্ট সমুদ্র উপকূল।
সাগরলতা গুল্ম সবুজ কার্পেটের মতো বিছিয়ে রয়েছে উপকূলে
সেই ১৮১৮ সালে উদ্ভিদবিজ্ঞানী রবার্ট ব্রাউন প্রথম এই বহুবর্ষজীবী চিরসবুজ লতাটির শনাক্তকরণ করে নামকরণ করেছিলেন। Convolvulaceae পরিবারের অন্তর্গত সাগরলতার বিজ্ঞানসম্মত নাম Ipomoea pes-caprae। ল্যাটিন শব্দ 'pes' এর অর্থ foot বা খুর। আর 'caprae' হল goat বা ছাগল। অর্থাৎ ছাগলের খুর। এর পাতার গঠন অনেকটা ছাগলের খুরের মতো। অগ্রভাগ চেরা। দুপাশে বিভক্ত। সেই বৈশিষ্ট্যের দরুন কথ্য ভাষায় এর নাম ছাগলখুরি তথা গোটস ফুট ভাইন (Goat's Foot Vine) বা গোটস ফুট ক্রিপার (Goat's Foot Creeper)।
সাগরলতার এই সুদৃশ্য ফুলের জন্য একে বলে 'বিচ মর্নিং গ্লোরি'
এই সাগরলতা অবশ্য আরও নানা নামে পরিচিত। অনেকেই একে বিচ মর্নিং গ্লোরি (Beach Morning Glory), বেহোপস্ (Bayhops), রেল রোড ভাইন (Railroad Vine), সাগর নিশিন্দা, নীল নিশিন্দা, সৈকত কলমী ইত্যাদি নামেও নামকরণ করেছে। সকালবেলা সমুদ্রের বিচ এলকায় ফুটতে দেখা যায়। খুব সুন্দর দৃশ্যের অবতারণা করে। তাই এর নাম বিচ মর্নিং গ্লোরি। এছাড়াও হিন্দিতে দো পাত্তি লতা, তামিলে আত্তুক্কাল, মারাঠী ও গুজরাটিতে মরয়াদা ভেল, তেলুগুতে বালাবান্টাটিগে, মালয়লামে পচাক্কাল ভাল্লি, আত্মাপুভাল্লি, পুলিচুভাদি, পুলিচুভাটু, কন্নড়ে বাঙ্গাদা, কেম্পু বাঙ্গাদাবল্লি, আদাম্বলি, দাসারি, আদাম্বু নামে ডাকা হয় সাগরলতাকে।
সারা পৃথিবীতে ৫০০ এর বেশি প্রজাতির সন্ধান মেলে। দীঘা, শঙ্করপুর, তাজপুর, উদয়পুর, জুনপুট, দাদনপাত্রবাড়, তালসারি, বিচিত্রপুর, ডাগারা, বারিপদা সহ বঙ্গোপসাগরীয় উপকূলীয় বালিয়াড়িতে দেখতে পাওয়া যায়। এক একটি গাছ প্রায় ৩০ মিটার পর্যন্ত লম্বা হয়। প্রতিটি পর্ব থেকে শিকড় গজায়। মাটির প্রায় ১০ ফুট গভীরে যায় শিকড়। ফলে খুব দৃঢ়ভাবে বালির সাথে আটকে থাকে। দড়ির মতো পড়ে থাকে বালিতে। তাই এটি একধরনের Sand Stabilizer বা Sand Binder বৈকি।
ছাগলের খুরের মতো সাগরলতার পাতা
বর্তমানে উপকূল এলাকায় বেআইনিভাবে নির্মাণকাজ চলছে জোরকদমে। উন্নয়নের নামে উপকূল ধ্বংস করা হচ্ছে। বালিয়াড়ির প্রাকৃতিক পরিবেশ নষ্ট হয়ে যাচ্ছে হোটেল, বসতবাড়ি সহ নানা সরকারি কাজের দরুন। তার জেরে ধ্বংসপ্রাপ্ত হচ্ছে সাগরলতার অস্তিত্ব। যা আসলে উপকূলীয় বায়োডাইভার্সিটি রক্ষার ক্ষেত্রে আতঙ্কের বিষয়। অথচ এই গাছের ওপর ভর করে খুব সহজে এবং কম খরচে উপকূলীয় বাঁধ, বালিয়াড়ি ও কৃষিজমি সমুদ্র গ্রাস থেকে বাঁচানো যেত। কিন্তু সরকারি উদাসীনতায় তা হয়নি। ফলে ক্রমশঃ বিপন্নতার দিকে এগিয়ে চলেছে সাগরলতা।
সাগরলতা হল গুল্ম জাতীয় গাছ। নরম বালুভূমিতে লতিয়ে লতিয়ে জন্মায়। যেন সবুজ মাদুর পাতা হয়েছে। এমনভাবে বালিয়াড়িতে আটকে থাকে যার ফলে ভূমিক্ষয় হয়না। প্রবল জলোচ্ছ্বাস বা সামুদ্রিক বাতাস হলেও সাগরলতা দিয়ে আবদ্ধ স্থলভাগের ক্ষয় হয়না। উপকূলীয় এলাকার প্রাকৃতিক রক্ষাকর্তা হল এই সাগরলতা।
এইভাবে বালিয়াড়িতে লতিয়ে লতিয়ে বংশবৃদ্ধি করে
সাগরলতার ফানেল আকৃতির গাঢ় বেগুনি রঙের ফুলের বৈশিষ্ট্য বেশ আকর্ষণীয়। তিন থেকে ১৬ সেন্টিমিটার দীর্ঘ। বালিয়াড়ি জুড়ে সবুজ পাতার ভিড়ে মাথা তুলে উঁকি মারে ফুল। বেড়াকলমী বা ঢোলকলমীর মতো দেখতে। সারা বছর ধরে ফুটলেও শীতের সময় কিছুটা কম ফোটে। মে মাস থেকে নভেম্বর পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি মাত্রায় ফুটতে দেখা যায়।
সাগরলতার বেষ্টনীতে সাগরভূমি
এদের লতাগুলো বেশ মোটা এবং মসৃণ। এদের পাতার গঠনগত বৈশিষ্ট্যের কথা আগেই উল্লেখ করা হয়েছে। সাগরলতা গাছ খুব দ্রুত বংশবিস্তার করে চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে। তবে সামুদ্রিক এলাকা ছাড়া সমতল এলাকায় জন্মায়না। বালিয়াড়ির প্রবল গরমেও বেঁচে থাকার ক্ষেত্রে এদের কোনও সমস্যা হয়না। এই লতা উপকুলীয় পাখি, জীবজন্তু এবং লাল কাঁকড়ার (Red Crab) রক্ষায় সহায়ক ভূমিকা নেয়। তাছাড়া জমির উপর মোটা পাতার আস্তরণ তৈরি করার জন্য মাটির মধ্যেকার জলীয় অংশ বাষ্পীভূত হয়না।
সাগরলতা
স্টিং রে মাছের কামড়ের যন্ত্রনা থেকে উপশমের জন্য এই গাছের পাতার রস কার্যকরী। কোথাও কোথাও লোকচিকিৎসার জন্য এর ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়। রিউমাটয়েড আর্থারাইটিস রোগের ক্ষেত্রেও ব্যবহৃত হয়। শারীরিক দুর্বলতা, বাতের ব্যথা, ডায়াবেটিস ইত্যাদি রোগের চিকিৎসার জন্য সাগরলতার পাতা ও শিকড় কাজে লাগে। আর প্রাকৃতিকভাবে উপকূল রক্ষা করার ক্ষমতা তো রয়েছেই সাগরলতা গুল্মটির।
2 Comments
সাগর লতা লোনা হাওয়া এবং উচ্চ তাপমাত্রা সহ্য করেও দ্রুত বেড়ে যায়, চর্ম রোগে বিশেষ উপকারী । খুব ভালো লেখা।
ReplyDeleteধন্যবাদ আপনাকে।।
Delete