জ্বলদর্চি

বাঁচার উত্তরাধিকার/পঞ্চম খণ্ড: পর্ব- ৭/কমলিকা ভট্টাচার্য

বাঁচার উত্তরাধিকার
পঞ্চম খণ্ড: পর্ব- ৭
কমলিকা ভট্টাচার্য 

হারগ্রিভের ছায়া

সকালের আলো উঠলেও ল্যাবরেটরির ভেতরে যেন রাতের ঘনতা রয়ে গেছে।
অনির্বাণ মনিটরের সামনে বসে আছে। লোকেশন ম্যাপ স্থির হয়ে জ্বলছে। সেই পুরোনো জায়গা—কলকাতার ল্যাব। যেখানে ঋদ্ধিমানের প্রথম নিউরাল পরীক্ষাগুলো হয়েছিল। যেখানে মানুষ আর যন্ত্রের মাঝামাঝি এক সত্তা তৈরি হয়েছিল।
আদর খুব চুপচাপ। কিন্তু তার চোখে কাজ চলছে। একবার ম্যাপ দেখে, একবার ঋদ্ধিমানের সিগন্যাল গ্রাফ। তারপর শান্ত গলায় বলে—
“আঙ্কেল নিজেকে লুকিয়ে রেখেছেন। সিগন্যাল পাঠাচ্ছেন, কিন্তু রিসিভ করছেন না।”
অনির্বাণ তাকায়, “মানে?”
“মানে… উনি চাইলে জেগে উঠতে পারতেন। কিন্তু ইচ্ছে করে উঠছেন না।”
এই কথাটাই অনির্বাণকে ভিতর থেকে কাঁপিয়ে দেয়।
ঋদ্ধিমান নিজের চেতনাকে আটকে রেখেছে।
মনে পড়ে সেই মেসেজ—
Prototype is ready. We want the child back.
এই ‘child’—এখন আর কোনো সন্দেহ নেই।
নাতাশা আর ইরা চুপচাপ শোনে। তাদের চোখে ভয় জমে। ইরা ধীরে বলে,
“তাহলে ওরা আদরকে চায়?”
আদর মাথা নাড়ে।
🍂
“হ্যাঁ। আর আঙ্কেল জানতেন।”
উপলব্ধিটা সবার বুকের ভেতর ভারি হয়ে বসে। ঋদ্ধিমান নিজের জীবন নয়—আদরের নিরাপত্তার জন্য নিজেকে নিস্তেজ করে রেখেছেন।
তখনই সিদ্ধান্ত হয়—অপেক্ষা করলে চলবে না।
নাতাশার শারীরিক অবস্থার কথা ভেবে ঠিক হয়, নাতাশা আর ইরা এখান থেকেই রিমোটলি সব মনিটর করবে। কিন্তু আদরকে নিয়ে যাওয়া মানে তাকে সরাসরি বিপদের মুখে ফেলা—এই ভাবনায় সবাই অস্থির হয়ে ওঠে।
আদর বড়দের মতো গলায় বলে,
“আমার কিছু হবে না। আঙ্কেলকে বাঁচাতে আমাকে যেতেই হবে।”
সেদিনই তারা রওনা হয়ে যায়।
কলকাতায় পৌঁছতে পৌঁছতে সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসে। পুরোনো ল্যাবের সামনে দাঁড়িয়ে অনির্বাণের বুকের ধড়ফড় বাড়ে। কত স্মৃতি, কত ভয়, কত বিস্ময়, কত অজানা এই জায়গার সঙ্গে জড়িয়ে।
ভিতরে ঢুকতেই আলো জ্বলে ওঠে একে একে।
আর তারা থমকে যায়।
সামনে দাঁড়িয়ে আছে—তিনজন ঋদ্ধিমান।
একই মুখ। একই চোখ। একই দেহভঙ্গি।
দৃশ্যটা এতটাই অস্বাভাবিক যে কয়েক সেকেন্ড কেউ কথা বলতে পারে না।
পেছন থেকে ধীর হাসি ভেসে আসে।
হারগ্রিভ সামনে এগিয়ে আসে। চোখে সেই পুরোনো ঔদ্ধত্য।
“Welcome, son. And my dear Anirban. জানতাম তোমরা আসবে।”
অনির্বাণের শরীর শক্ত হয়ে যায়। এই মানুষটাকে সে ভুলতে পারেনি।
হারগ্রিভ হাত তুলে তিনজন ঋদ্ধিমানের দিকে দেখিয়ে বলে—
“চিনে নাও। কোনটা আসল?”
কথা শেষ হতেই লোকজন এসে মুহূর্তে অনির্বাণ আর আদরকে বেঁধে ফেলে।
একটি ‘ঋদ্ধিমান’ এগিয়ে এসে তাদের মাথায় বন্দুক ধরে।
দৃশ্যটা অবাস্তব লাগে।
অনির্বাণ দাঁতে দাঁত চেপে বলে,
“আপনারা কি চান?”
হারগ্রিভ খুব শান্ত স্বরে বলে,
“এই বিরল মস্তিষ্কের শিশুটি।”
অনির্বাণ চেঁচিয়ে ওঠে,
“কক্ষনো না!”
আদর আশ্চর্য শান্ত গলায় বলে,
“তোমরা আমাকে নয়, আমার ব্রেনটা চাও, তাই না? স্ক্যান করে নাও। আঙ্কেলকে ছেড়ে দাও।”
অনির্বাণ চিৎকার করে ওঠে,
“না আদর! তুমি জানো ওরা তোমার ব্রেন মানবতার বিরুদ্ধে ব্যবহার করবে!”
হারগ্রিভ এগিয়ে এসে আচমকা অনির্বাণকে জোরে আঘাত করে।
চোখের সামনে অন্ধকার নেমে আসে।
অচেতন হওয়ার আগে অনির্বাণ দেখে—আদরকে টেনে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে ল্যাবের ভেতরের দিকে।
হারগ্রিভের ঠোঁটে বিজয়ের হাসি।

তারা স্বচ্ছ কাঁচের ঘরের ভেতরে আদরকে বসায়। মাথায় অসংখ্য নিউরাল সেন্সর যোগ করে।
তার সামনে দাঁড়িয়ে তিনজন ঋদ্ধিমান।
আদর বুঝতে পারে এরা কেউই
আসল উন্নত হিউম্যানঅয়েড নয়। 
 ক্লোনড মোটর-বডি, যেগুলো ঋদ্ধিমানের পুরোনো নিউরাল ম্যাপ থেকে বানানো হয়েছে চেতনা নেই তাতে।
তবে এদের ভিতরে একটি ভিজ্যুয়াল প্রজেক্সনের মত।
যা সাধারন চোখে দেখলে বাস্তব উপস্থিত মনে হলেও একচুয়ালি নেই।
আদরের চোখে সেই তফাৎ টুকু ধরা পড়ে,সে ভাবতে থাকে এই কি তার ঋদ্ধিমান আংকেল।
হারগ্রিভের কণ্ঠ ভেসে আসে—
“এই শিশুর মস্তিষ্ক… সেটাই আমাদের ভবিষ্যতের  চাবি তাড়াতাড়ি  কাজ শুরু করো।”

আদরের ব্রেইনের স্ক্যানএ শুরু হয়।
হারগ্রিভ হেসে বলে,
“I am about to redesign humanity.”
ঠিক তখনই অদ্ভুত কিছু ঘটে।
মনিটরের গ্রাফ হঠাৎ উল্টো দিকে যেতে শুরু করে।
আদরের ব্রেনওয়েভ স্ক্যান হচ্ছে না।
বরং—স্ক্যানারগুলোর ডেটা আদরের ভেতরে ঢুকে যাচ্ছে।
হারগ্রিভ চমকে ওঠে।
“What is happening?!”
একটি ‘ঋদ্ধিমান’ হঠাৎ থমকে যায়। তারপর ধীরে ধীরে মাথা ঘুরিয়ে আদরের দিকে তাকায়।
তার ঠোঁট নড়ে ওঠে—
“আদর…”
এটা রেকর্ডেড ভয়েস না।
এটা ঋদ্ধিমান।
আদর চোখ না খুলেই বলে—
“আমি জানতাম আঙ্কেল তুমি লুকিয়ে আছ।”
হারগ্রিভ চিৎকার করে ওঠে,
“Shut it down! Shut everything down!”
কিন্তু দেরি হয়ে গেছে।
আদর স্ক্যান হতে আসেনি।
সে এসেছে ঋদ্ধিমানকে ফিরিয়ে আনতে।
পুরো সিস্টেম এখন উল্টো দিকে কাজ করছে।
ঋদ্ধিমানের চেতনা, যা লুকিয়ে ছিল নেটওয়ার্কের গভীরে, আদরের নিউরাল প্যাটার্নকে মাধ্যম করে ফিরে আসছে।
ল্যাবের
লাইট দপদপ করে ওঠে।
হারগ্রিভ প্রথমবারের মতো ভয় পায়।
কিন্তু সহজে হার মানার নয়।
সে সমস্ত ল্যাবের ইলেকট্রিক সিগন্যাল বন্ধ করে দেয়।
আদর ঝিমিয়ে পড়ে।

Post a Comment

1 Comments

  1. AnonymousMay 07, 2026

    Tan tan galpo. suspense proti patay. lekhakke abhinandan ❤️

    ReplyDelete