জ্বলদর্চি

ব্রহ্মসূত্র -- শঙ্কর মতানুসারী প্রস্থানত্রয়ের একটি/পর্ব ৯/প্রীতম সেনগুপ্ত

ব্রহ্মসূত্র -- শঙ্কর মতানুসারী প্রস্থানত্রয়ের একটি

পর্ব ৯

প্রীতম সেনগুপ্ত 

চার্বাক এবং অন্যান্য বেদ বিরোধী সম্প্রদায় দ্বারা প্রাচীন বৈদিক সমস্ত মতবাদের ধ্বংসাত্মক বা নেতিবাচক সমালোচনায় বাধ্য হয়ে নিষ্ঠাবান প্রাচীনপন্থীরা নিজেদের দার্শনিক চিন্তাকে এমন একটি দৃঢ় ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত করেন যা অন্যের দ্বারা অখণ্ডনীয় হয়ে ওঠে। এই দার্শনিক চিন্তা থেকেই জন্ম নেয় ছয়টি আস্তিক্য হিন্দু দর্শন। যাঁরা অতীন্দ্রিয় বস্তু নির্ণয়ে বেদের প্রামাণ্যকে স্বীকার করতেন তাদেরকে আস্তিক বলা হয়েছে। যারা  অস্বীকার করতেন  তাদেরকে নাস্তিক বলে আখ্যা দেওয়া হতো। যদিও একথা বলা যায় এই নাস্তিকদের চিন্তাও ছিল উপনিষদের চিন্তারই ফলশ্রুতি। আস্তিক দার্শনিকরা বেদকে প্রামাণ্য হিসেবে গ্রহণ করলেও তাঁরাও সকলে বেদকে হুবহু, সর্বোতভাবে গ্রহণ করতেন বলে ধরে নেওয়া যায় না। তাঁদের বেদের প্রতি আনুগত্যের মধ্যেও বেশ প্রভেদ ছিল এবং জায়গা বিশেষে আস্থাও ছিল বেশ নড়বড়ে। ছয়টি আস্তিক্য দর্শন হল -- ন্যায়, বৈশেষিক, সাংখ্য, যোগ, পূর্ব মীমাংসা এবং উত্তর মীমাংসা বা বেদান্ত। এই ছয়টি দর্শনের মধ্যে শেষের দুইটি ( পূর্ব ও উত্তর মীমাংসা ) বেদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পৃক্ত। জৈন এবং বৌদ্ধ সাহিত্যে এদের উল্লেখ না থাকার এটাও একটা কারণ, তাঁরা অন্য দর্শনগুলির কিন্তু উল্লেখ করেছেন।

🍂

এই ছয়টি আস্তিক্য দর্শন ভারতের সর্বত্রই একই সঙ্গে প্রচলিত ছিল এবং বিভিন্ন বিদ্বৎগোষ্ঠীতে পরিপুষ্ট হচ্ছিল।  ঔপনিষদিক যুগের এই সমস্ত মতবাদ বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে প্রচলিত ছিল এবং প্রত্যেকটি মতবাদেরই  বহু শাখাপ্রশাখাও ছিল। ভারতে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে নানা দার্শনিক চিন্তার প্রসার ঘটেছিল। এইভাবে এইসব অসংগঠিত দার্শনিক চিন্তাকে সংহত করতে এবং বিন্যস্ত করতে বিশেষ প্রয়োজন বোধ করার ফলে সূত্র শাস্ত্রের উৎপত্তি।

সূত্র কী?

“গুরুগৃহে শিষ্যগণ আচার্য শিক্ষকের নিকট নানা বিষয়ে শিক্ষা গ্রহণকালে যে সব বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করিতেন, তাহাকে স্মরণ রাখার জন্য কতকগুলি সাংকেতিক শব্দের দ্বারা উহাকে নিবদ্ধ করা হইত। এই সাংকেতিক সংক্ষিপ্ত শব্দরাশিকে বলা হয় সূত্র --- যাহার অর্থ সন্ধানলাভের সহায়ক। ( এই সূত্র হইতেই অধীত বা জ্ঞাতব্য জ্ঞানের সন্ধান পাওয়া যায়। কালক্রমে শাস্ত্রের বিস্তারিত অংশকে স্মরণ রাখার সহায়তার জন্য সুসংবদ্ধ সূত্র গ্রন্থের উৎপত্তি হয়। ) খুবই সংক্ষিপ্ত আকারে চিন্তাকে সূত্রের মধ্যে নিবদ্ধ করা হয়, কারণ ইহা ধরিয়া লওয়া হয় যে, এই চিন্তার অনেকটা অংশই সূত্র পাঠকের জানা আছে। ইহার ফলে চিন্তারাশির সর্বাধিক অংশকে যথাসম্ভব ন্যূনতম অল্প কয়েকটি শব্দের মধ্যেই সূত্রাকারে গ্রথিত করিয়া রাখা হয়। ব্রহ্মসূত্রের ভাষ্যে মধ্বাচার্য পদ্মপুরাণ হইতে সূত্রের এই সংজ্ঞাটি উদ্ধৃত করিয়াছেন ---- অল্পাক্ষরমসংদিগ্ধং সারবদ্বিশ্বতোমুখম্।/ অস্তোভমনবদ্যং চ সূত্রং সূত্রবিদো বিদুঃ।।

‘সূত্র-শাস্ত্রাভিজ্ঞ পণ্ডিতগণ মনে করেন সূত্র হইবে সংক্ষিপ্ত এবং দ্ব্যর্থহীন, আলোচ্য বিষয়ের সারাংশ দ্যোতক অথচ সকল প্রশ্নের প্ররোচক, পুনরুক্তি বর্জিত এবং ত্রুটিহীন।’ যদিও সূত্রের সংজ্ঞায় বলা হইয়াছে সূত্র কিরূপ হওয়া উচিত, তথাপি ব্যবহার ক্ষেত্রে দেখা যায় যে, সূত্রকে সংক্ষিপ্ত করিবার প্রবণতা এতই প্রবল হইয়া উঠিয়াছিল যে, বর্তমানে সূত্রশাস্ত্রের অধিকাংশই প্রায় দুর্বোধ্য হইয়া উঠিয়াছে। বিশেষত বেদান্ত সূত্র সম্পর্কে দুর্বোধ্যতা খুবই প্রকট যাহার ফলে বেদান্তের বহু শাখার ( মতবাদের) উৎপত্তি হইয়াছে।” ( ব্রহ্মসূত্র -- মূল, অন্বয়, বঙ্গানুবাদ, শাঙ্কর মতানুযায়ী ব্যাখ্যা ও নির্দেশিকা, স্বামী বীরেশ্বরানন্দ )

Post a Comment

0 Comments