জ্বলদর্চি

বাঁচার উত্তরাধিকার /পঞ্চম খণ্ড: পর্ব -৫ /কমলিকা ভট্টাচার্য

বাঁচার উত্তরাধিকার 
পঞ্চম খণ্ড: পর্ব -৫ 
কমলিকা ভট্টাচার্য 

নীরবতার ভেতরে জেগে ওঠা


এর মধ্যে কয়েকটা বছর কেটে গেছে। আদর এখন আর দশটা সাধারণ বাচ্চার মতোই স্কুলে যায়, খেলে, হোমওয়ার্ক করে। কিন্তু এই স্বাভাবিকতার আড়ালেও তার উজ্জ্বল মস্তিষ্কের দীপ্তি বারবার ধরা পড়ে। তবু ইরা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ—সেসব আড়ালেই থাকবে, সে বড় হবে একেবারে স্বাভাবিকভাবে।
এদিকে বেশ কিছুদিন ধরে ঋদ্ধিমান হঠাৎ হঠাৎ নিস্তেজ হয়ে পড়ছে। অনির্বাণ নানা ভাবে তাকে সতেজ রাখার চেষ্টা করে, কিন্তু একদিন আচমকা সে পুরোপুরি থেমে যায়।
হঠাৎ যেন নতুন এক সমস্যা দানা বাঁধে।
ল্যাবরেটরির কাঁচের দেওয়ালে বিকেলের আলো এসে এমনভাবে পড়েছে—যেন সময় নিজেই থমকে দাঁড়িয়েছে। শ্বাস আটকে আছে, শুধু অপেক্ষা।
ঋদ্ধিমান নিস্তেজ। তার বুক ওঠানামা করছে না। অথচ মুখে এক অদ্ভুত শান্তি—যেন বহুদিনের ক্লান্তির পর সে গভীর ঘুমে ডুবে আছে।
অনির্বাণের চোখ লাল। সে বারবার মনিটরের দিকে তাকাচ্ছে—যেন সংখ্যাগুলো হঠাৎ বদলে যাবে, যেন কোনো অলৌকিক সংকেত এসে বলবে, সব ঠিক আছে।
কিছুই বদলায় না।
ইরা চুপচাপ দাঁড়িয়ে। ভেতরটা কাঁপছে, তবু সে জানে—এখন ভেঙে পড়ার সময় নয়।
এই জমাট নীরবতার ভেতরেই প্রথম নড়ে ওঠে নাতাশার আঙুল। এতটাই সামান্য যে কেউ খেয়াল করে না। কয়েক সেকেন্ড পরে আবার।
মনিটরের সরু রেখাটা খুব হালকা কেঁপে ওঠে।
অনির্বাণ প্রথম দেখে। তার শ্বাস গলায় আটকে যায়। সে এগিয়ে আসে।
— “নাতাশা…?”
কোনো উত্তর নেই। কিন্তু চোখের পাতায় কাঁপন দেখা যায়।
ধীরে। খুব ধীরে। যেন বহু দূরের অন্ধকার ভেদ করে—তার চোখ খুলে যায়। দৃষ্টি অস্পষ্ট, তবু সচেতন। যেন সে দীর্ঘ এক অন্তর্গত যাত্রা শেষে ফিরে এসেছে।
সে কথা বলতে পারে না। কিন্তু চোখে তীব্র এক বোধ—সবকিছু সে জানে, সব শুনেছে, সব দেখেছে।
অনির্বাণ তার হাত ধরে কাঁপা গলায় বলে,
— “ঋদ্ধিমান শেষ হয়ে যাচ্ছে… তুমি ছাড়া আমি ওকে বাঁচাতে পারব না।”
নাতাশার চোখে অদ্ভুত এক দৃঢ়তা জমে ওঠে। যেন এই শকটাই তার দরকার ছিল।
সে আঙুল তুলে ইশারা করে—ল্যাব, কনসোল, ডেটা।
ইরা বুঝতে পারে। খুব যত্নে নাতাশাকে হুইলচেয়ারে বসিয়ে কনসোলের সামনে আনা হয়।
কীবোর্ডে নাতাশার আঙুল ছোঁয়ামাত্র স্ক্রিনে একের পর এক কোড খুলতে থাকে। ভেসে ওঠে পুরোনো ব্যাকআপ ফাইল।
Neural Architecture Archive.
ঋদ্ধিমান একদিন সব ব্যাকআপ রেখে দিয়েছিল, কিন্তু কখনো খোলেনি। আজ নাতাশা খুলছে।
ফাইলগুলো খুলতেই বোঝা যায়—এ শুধু ডেটা নয়, একটা মানচিত্র।
🍂
কৃত্রিম নিউরনের মানচিত্র।
চেতনাকে কীভাবে ধরে রাখা যায়। স্মৃতি কীভাবে পুনর্গঠন করা যায়।
নাতাশার চোখে জল আসে। সে জানে—এই পথটাই একমাত্র পথ।
এদিকে স্কুল থেকে ফিরে ইরার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে আদর। ইরার চোখ লাল, কণ্ঠ শুকনো।
আদর আস্তে জিজ্ঞেস করে,
— “যশোদামা, তুমি কাঁদছো কেন?”
ইরা উত্তর দিতে পারে না। শুধু তাকে জড়িয়ে ধরে।
আদরের মাথার ভেতর গত কয়েকদিনের সব কথা ছবির মতো ভেসে ওঠে—ল্যাব, ঋদ্ধিমান, অসুস্থতা, কোড, নিউরাল সিগন্যাল… এমনকি নাতাশাকেও সে যেন দেখতে পায়।
হঠাৎ সে বলে ওঠে,
— “আমাকে ল্যাবে নিয়ে চলো। মা-ও তো সেখানেই আছে।”
ইরা থমকে যায়।
— “কেন? তুমি কী করে জানলে?”
আদর শুধু বলে,
— “দেখতে হবে।”
অদ্ভুত এক টানে ইরা তাকে নিয়ে যায়।
ল্যাবে ঢুকেই আদর প্রথমে মাকে জড়িয়ে ধরে—যে স্নেহের জন্য সে এত বছর অপেক্ষা করেছে। কিন্তু পরের মুহূর্তেই সে ছুটে যায় ঋদ্ধিমানের কাছে।
সে স্থির হয়ে দাঁড়ায়। যেন জানে—এখনের প্রতিটি মুহূর্ত অমূল্য। নিজের আবেগের চেয়ে ঋদ্ধিমান আঙ্কেলকে বাঁচানো অনেক বেশি জরুরি।
মনিটরের দিকে তার চোখ স্থির হয়ে যায়।
সে ডেটা পড়তে থাকে।
নাতাশা বিস্ময়ে দেখে—আট বছরের একটি শিশু নিউরাল গ্রাফ বুঝে ফেলছে।
আদর শান্ত গলায় বলে,
— “এটা নিউরাল ওভারহিট না… এটা সিগন্যাল লস।”
অনির্বাণ অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে,
— “তুমি বুঝলে কী করে?”
আদর উত্তর দেয় না। সে কনসোলের দিকে এগিয়ে যায়।
স্ক্রিনে আর্কাইভ খোলা।
আদরের চোখ জ্বলে ওঠে। সে ধীরে বলে,
— “এখানেই উত্তর আছে…”
ইরার মনে পড়ে—ঋদ্ধিমান একদিন বলেছিল, আদর আমাদের থেকেও দ্রুত শিখছে।
নাতাশা তখন বুঝতে পারে—আদর শুধু বুদ্ধিমান নয়; সে নকশাটা স্বতঃসিদ্ধভাবে বুঝতে পারছে, যেন এই জ্ঞান তার ভেতরেই ছিল।
নাতাশার শরীর দুর্বল। কিন্তু তার মস্তিষ্ক আগুনের মতো জ্বলছে।
সে টাইপ করে:
Neural bridge required.
আদর পড়ে মাথা নাড়ে।
— “হ্যাঁ। একটা ব্রিজ বানাতে হবে। যাতে ঋদ্ধিমান আঙ্কেল আবার সিগন্যাল পায়।”
অনির্বাণ স্তব্ধ হয়ে বুঝতে পারে—এই মুহূর্তে ঘরের সবচেয়ে সক্ষম ব্যক্তি আদর।
হঠাৎ ইরা মেঝেতে বসে পড়ে। তার মনে পড়ে যায় নিজের গল্প—কীভাবে ঋদ্ধিমান তাকে ফিরিয়ে এনেছিল। কিভাবে সেও একসময় নিস্তেজ ছিল।
আদর তার পাশে এসে বসে। ইরার চোখের জল মুছে দেয়।
— “তুমি তো বলেছিলে, ঋদ্ধিমান আঙ্কেল বাবা, মা, তোমাকে, আমাকে—আমাদের সবাইকে বাঁচিয়েছিল।”
ইরা মাথা নাড়ে।
আদর শান্ত স্বরে বলে,
— “এবার আমরা সবাই ওনাকে বাঁচাবো।”
ইরার বুক কেঁপে ওঠে। এই প্রথম সে বুঝতে পারে—আদর আর শুধু শিশু নেই।
নাতাশা, অনির্বাণ, ইরা—তিনজনেই আদরের দিকে তাকিয়ে থাকে। তাদের চোখে একই প্রশ্ন—এ কি সম্ভব?
আদর কনসোলে বসে নতুন ডায়াগ্রাম আঁকতে শুরু করে।
নিউরাল ব্রিজ। মেমোরি রিলে। সিগন্যাল রিস্টোরেশন পাথ।
ল্যাবের আলো ধীরে কমে আসে।
ঋদ্ধিমান নিস্তেজ।
নাতাশা ক্লান্ত, তবু চোখ জেগে।
ইরা আদরকে জড়িয়ে।
অনির্বাণ মনিটরের সামনে দাঁড়িয়ে।
স্ক্রিনে নতুন ডায়াগ্রাম জ্বলছে।
আদর আস্তে বলে,
— “আমি ওনাকে ফিরিয়ে আনবো।”
তার কণ্ঠে কোনো দ্বিধা নেই। কোনো ভয় নেই। শুধু নিশ্চিত বিশ্বাস।
সেই মুহূর্তে নাতাশা, অনির্বাণ, ইরা বুঝতে পারে—
বাঁচার উত্তরাধিকার সত্যিই সঠিক হাতে পৌঁছেছে।

Post a Comment

2 Comments

  1. AnonymousMay 05, 2026

    শিশুরা কি তাড়াতাড়ি বড় হয়ে যাচ্ছে সত‍্যি শিশুদের ডি এন এ পাল্টে যাচ্ছে। এমন সব কথা মনে আসছে লেখা পড়ে। যাকে বলে চিন্তা উদ্রেককারী লেখা।

    ReplyDelete
  2. কমলিকাMay 05, 2026

    এই সব অলরেডি হওয়া শুরু হয়ে গেছে।শুধু এটা যেন মানবতার খুন না করে সেটাই চিন্তার।

    ReplyDelete