শঙ্খধ্বনি ও আজানের মাঝে : কবি নজরুল ইসলাম

কমলিকা ভট্টাচার্য

ছোটবেলায় প্রাইমারি স্কুলে পড়েছিলাম কাজী নজরুল ইসলামের সেই বিখ্যাত কবিতার লাইন—
“মোরা একই বৃন্তে দুটি কুসুম হিন্দু মুসলমান।”
তখন সাম্প্রদায়িকতা কী, ধর্ম নিয়ে মানুষের বিভেদই বা কেন—এসব কিছুই বুঝতাম না। শুধু ছন্দটা ভালো লাগত। মনে হতো, মানুষে মানুষে মিলেমিশে থাকার কথা বলছে কবিতাটা। খুব সহজ কিছু কথা, অথচ অদ্ভুত সুন্দর। ছোটবেলার মন সেই কথাগুলোকে নিঃশর্তভাবে বিশ্বাস করেছিল।

তারপর ধীরে ধীরে বড় হলাম। বুঝতে শিখলাম হিন্দু-মুসলিমের রীতিনীতি আলাদা, উৎসব আলাদা, প্রার্থনার ধরন আলাদা। সমাজের নানা জায়গায় বিভেদের রেখাও চোখে পড়তে লাগল। তখন থেকেই মানুষটা আমাকে নতুন করে ভাবাতে শুরু করলেন। একজন মুসলিম কবি হয়ে কীভাবে তিনি এমন অপূর্ব শ্যামাসংগীত লিখলেন? কীভাবে “আমার কালো মেয়ের পায়ের তলায়” কিংবা “বল রে জবা বল” এর মতো গান সৃষ্টি করলেন? শুধু কি তাই? আবার তিনিই লিখলেন “রমজানের ঐ রোজার শেষে” বা “নাম মোহাম্মদ বোল রে মন”—যা মুসলিম সমাজের ধর্মীয় অনুভূতির সঙ্গে একেবারে মিশে আছে।

তখন মনে হতে শুরু করল, ছোটবেলায় পড়া সেই কবিতার কথাগুলো তিনি শুধু লেখেননি, নিজের জীবন আর সৃষ্টির মধ্য দিয়েও সত্যি করে দেখাতে চেয়েছিলেন।

কবি নজরুল ইসলামের ভক্তিগীতি নিয়ে ভাবতে গেলেই আমার প্রথমে এই কথাটাই মনে হয়—তিনি ধর্মকে দূরত্বের জায়গা হিসেবে দেখেননি। তিনি ধর্মের ভেতরে মানুষের আবেগটাকে খুঁজেছেন। তাই তাঁর গানে ভক্তি মানে শুধু পূজা বা প্রার্থনা নয়, ভক্তি মানে ভালোবাসা, আত্মসমর্পণ, কখনও প্রতিবাদ, কখনও আবার মায়ের কোলে মাথা রেখে কান্না।

শ্যামাসংগীতে কবি নজরুল ইসলাম যেন একেবারে অন্য মানুষ। তাঁর কালী কোনো দূরের দেবী নন, তিনি যেন ঘরের মা। “আমার কালো মেয়ের পায়ের তলায়” গানের মধ্যে যেমন মাতৃস্নেহ আছে, তেমনই আছে এক অদ্ভুত আবেগের টান। মনে হয় কবি শুধু দেবীকে ডাকছেন না, নিজের সমস্ত ক্লান্তি আর যন্ত্রণা নিয়েও তাঁর কাছে আশ্রয় চাইছেন। সেই কারণেই হয়তো তাঁর গান শুনলে ধর্মের কথা আলাদা করে মনে থাকে না, আগে ছুঁয়ে যায় অনুভূতিটা।

আবার “বল রে জবা বল” গানটিতে কবি নজরুল ইসলাম যেন প্রকৃতিকেও ভক্তির অংশ করে তুলেছেন। একটি ছোট্ট জবা ফুলের সঙ্গে কথোপকথনের মধ্য দিয়ে তিনি মা কালীর প্রতি ভক্তির গভীর অনুভূতি প্রকাশ করেছেন। এখানে ভক্তি কোনো কঠিন ধর্মীয় আচার নয়, বরং এক সরল হৃদয়ের আবেগ। সেই সরলতাই গানটিকে এত আপন করে তোলে।

“জাগো দেবী দুর্গা” গানের মধ্যে আবার দেখা যায় শক্তির আহ্বান। সেখানে দেবী শুধু পূজার প্রতিমা নন, অন্যায়ের বিরুদ্ধে জেগে ওঠার প্রতীক। 
কবি নজরুল ইসলামের ভক্তিগীতির এই দিকটি আমাকে বিশেষভাবে আকর্ষণ করে। কারণ তিনি দেবদেবীদের শুধু অলৌকিক শক্তি হিসেবে দেখেননি, মানুষের জীবনের সঙ্গে মিলিয়েও দেখেছেন।

শুধু কালী বা দুর্গা নন, কৃষ্ণভক্তিমূলক গানেও কবি নজরুল ইসলামের আবেগ অসাধারণ। তাঁর অনেক গানে বৈষ্ণব পদাবলীর কোমল প্রেমভাব মিশে আছে। সেখানে কৃষ্ণ কখনও ঈশ্বর, কখনও প্রিয়জন। ফলে ভক্তি আর ভালোবাসা একাকার হয়ে যায়।

আবার ইসলামি গানগুলোর দিকে তাকালেও একই বিষয় চোখে পড়ে। “রমজানের ঐ রোজার শেষে” শুধু একটি উৎসবের গান নয়, সেখানে আছে সংযমের আনন্দ, আত্মশুদ্ধির আহ্বান। “তোরা দেখে যা আমিনা মায়ের কোলে” শুনলে মনে হয় একজন কবি কত গভীর মমতা নিয়ে নবীজির জন্মকে অনুভব করেছেন। তাঁর ইসলামি গানের মধ্যেও কোথাও কোনো কৃত্রিমতা নেই। কারণ তিনি ধর্মকে বাইরে থেকে দেখেননি, অনুভব দিয়ে ছুঁয়েছিলেন।

আমার ব্যক্তিগতভাবে সবচেয়ে আশ্চর্য লাগে এইখানে—তিনি কখনও কোনো ধর্মকে ছোট করেননি, আবার অন্ধ ভক্তিও দেখাননি। বরং সব ধর্মের ভেতর থেকে মানবতার সুরটাই তুলে এনেছেন। তাই তাঁর গানে একদিকে যেমন শঙ্খধ্বনি শোনা যায়, অন্যদিকে আজানের সুরও ভেসে আসে। আর এই দুইয়ের মিলনটাই তাঁকে এত বড় করে তোলে।

কবি নজরুল ইসলামকে শুধু “বিদ্রোহী কবি” বললে তাই তাঁর সম্পূর্ণ পরিচয় দেওয়া হয় না। তাঁর ভেতরে এক গভীর আধ্যাত্মিক মানুষও ছিলেন। যে মানুষটি বুঝেছিলেন, সমাজের সবচেয়ে বড় সমস্যা ধর্ম নয়, সমস্যা মানুষের সংকীর্ণতা। তাই তিনি গান দিয়ে সেই সংকীর্ণতার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিলেন। হয়তো সেই কারণেই তাঁর ভক্তিগীতিতে কখনও বিভেদের গন্ধ পাওয়া যায় না।

আরও একটা বিষয় আমাকে খুব টানে। কবি নজরুল ইসলামের ভাষা। তাঁর গানে কোনো জটিলতা নেই। খুব সাধারণ শব্দ, অথচ তার মধ্যেই অদ্ভুত শক্তি। মনে হয় যেন একজন মানুষ নিজের মনের কথা খুব সহজ করে বলে যাচ্ছেন। সেই সরলতাই তাঁর গানকে মানুষের এত কাছের করে তুলেছে। গ্রামের মানুষ থেকে শহরের শিক্ষিত শ্রোতা—সবাই তাঁর গান নিজের মতো করে অনুভব করতে পারে।

কবি নজরুল ইসলামের গান শুনলে মনে হয়, ভক্তি আসলে মানুষের হৃদয়ের ভাষা। সেখানে ধর্মের দেয়াল খুব বড় হয়ে দাঁড়াতে পারে না। একজন মানুষ মা কালীর কাছে যেমন চোখের জল ফেলতে পারেন, তেমনই আল্লাহর কাছেও মাথা নত করতে পারেন। আর এই সত্যিটাই কবি নজরুল ইসলাম তাঁর গানের মাধ্যমে আমাদের বুঝিয়ে গেছেন।

আজকের সময়ে দাঁড়িয়ে তাঁর গান আরও বেশি প্রাসঙ্গিক মনে হয়। চারদিকে যখন ধর্ম নিয়ে বিভাজন, তর্ক, বিদ্বেষ চোখে পড়ে, তখন কবি নজরুল ইসলামের গান যেন অন্য এক শিক্ষা দেয়। তিনি যেন মনে করিয়ে দেন—মানুষ আগে, ধর্ম পরে। ভক্তি আগে, পরিচয় পরে।

হয়তো সেই কারণেই ছোটবেলায় পড়া সেই লাইনটা আজও এত সত্যি মনে হয়—
“মোরা একই বৃন্তে দুটি কুসুম হিন্দু মুসলমান।”
এখন বুঝতে পারি, এটা শুধু কবিতার একটি সুন্দর পংক্তি ছিল না। এটা ছিল কবি নজরুল ইসলামের বিশ্বাস। তাঁর জীবনদর্শন। আর তাঁর ভক্তিগীতিগুলো যেন সেই বিশ্বাসেরই সুরেলা ব্যাখ্যা।

🍂