দর্শনের আলোকে
ঊনবিংশতি পর্ব
স্বাতী ভৌমিক
(দার্শনিক জ্ঞানের প্রায়োগিক প্রয়োজনীয়তা)
জীবনে চলার পথে দার্শনিক জ্ঞানের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে আলোচনা প্রসঙ্গে সর্বাগ্রে বোঝা প্রয়োজন যে, 'দার্শনিক জ্ঞান' আসলে কি? পূর্ববর্তী বিভিন্ন আলোচনার মাধ্যমে দর্শন সম্পর্কে মোটামুটি কিছুটা আলোকপাত করা হয়েছে। দর্শন বিশেষ কোনো বিষয় নয়- দর্শন হলো সামগ্রিক জ্ঞান। জগত এবং জীবন সম্পর্কে পরিপূর্ণ জ্ঞান লাভের উপায় হলো দর্শন। গতানুগতিক ভাবধারায় অন্ধভাবে প্রভাবিত না হয়ে নিজস্ব বিচারবোধের আলোকে বিষয়ের উপলব্ধি করাই হলো দার্শনিক উপলব্ধি।
ব্যবহারিক জীবনে সহনশীলতা,ধৈর্য সহকারে পর্যবেক্ষণ ও বিচারক্ষমতা- এগুলো খুব প্রয়োজন। দর্শন শেখায়, একটি বিষয়ে মতভেদ থাকতেই পারে- বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখাও ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু তাতে বিষয় নিজস্ব স্বরূপ হারায় না।
🍂
দৃষ্টিগ্রাহ্য রূপের অন্তরালে এক বৃহৎ অনুভূতিলব্ধ এবং অতীন্দ্রিয় জগত আছে। সেই জগত সম্পর্কেও জ্ঞানলাভ না করলে জ্ঞান কখনো তার পূর্ণতা পেতে পারে না। পঞ্চভূতের(ক্ষিতি, অপ্, তেজ, মরুৎ এবং ব্যোম) সম্মিলিতরূপে সৃষ্ট এই দৃশ্যমান বাহ্য বিষয়সকল একদিন কিন্তু আবার পঞ্চ ভূতেই বিলীন হয়। আমরা সাধারণ মানুষেরা ওই দৃশ্য-রূপ টুকু নিয়েই ব্যস্ত থাকি কিন্তু এর বাইরে যে বৃহৎ জগৎ রয়েছে তাও যে জানা যায়, তা আমরা দর্শনের সামগ্রিক জ্ঞানের প্রেক্ষাপটে জানতে পারি।
বর্তমান পৃথিবীতে যে অস্থিরতা- চাঞ্চল্যময় পরিস্থিতি দৃষ্ট হয়, তার মূল কারণ হলো জড়াবিদ্যার উপর- জড় বিষয়ের উপর অত্যধিক গুরুত্ব আরোপ।এত প্রতিযোগিতা কীসের! এই জগতে কে কার মতো! সবাই অনন্য। এই অনন্যতা যদি ব্যক্তি স্বয়ং-ই না বোঝে, না গুরুত্ব দেয়, অন্যের মতো হওয়া- অন্যের সাথে তুলনা করায় নিজেকে মত্ত রাখে, তাহলে সেই অনন্য রূপের উদ্ঘাটন হবে কিভাবে! প্রত্যেক জীব তার স্বীয় সম্ভাবনা কাজে লাগিয়ে এই পৃথিবীকে কোন না কোনভাবে সমৃদ্ধ করার মতো ক্ষমতা রাখে। কিন্তু পরানুকরণ আর পরশ্রীকাতরতারূপ অজ্ঞতার আবরণে আবরিত হয়ে যায় সেই সম্ভাবনা। যারা এটা উপলব্ধি করতে পারে, তারা ঠিকই নিজ প্রতিভার, নিজ অনন্যতার ছাপ- স্বীয় সৃষ্টি এই পৃথিবীতে রাখতে সচেষ্ট হয় এবং সৃষ্টির জগতকে সমৃদ্ধ করে।
আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাও এর জন্য কম দায়ী নয়। বলা যায়, শিক্ষার বিশাল ভূমিকা আছে এই সচেতনতা এবং এই অনন্যতা রক্ষার ক্ষেত্রে। সৃজনশীল পাঠক্রম কোথায়!শিক্ষার্থীদের ভাবনার মৌলিকতা দেখানোর জায়গা শিক্ষাক্ষেত্রে কতটা আছে! যদিও বা কোন ক্ষেত্রে আশার রেখা দেখা যায় পরবর্তীক্ষেত্রে 'ইঁদুর দৌড়ে' সামিল হতে গিয়ে তা লুপ্তপ্রায় এর পথে এগিয়ে যায়। আসল ক্ষমতা- সম্ভাবনা তো ব্যক্তির মধ্যেই থাকে। তার ঝলক ফুটে ওঠে তার কর্মে -তার বাহ্যিক প্রকটমানতায়। তাহলে এই অন্তর সম্পদের রক্ষণাবেক্ষণের ব্যবস্থা করা সর্বাগ্রে প্রয়োজন। এর জন্য প্রয়োজন ধীরতা- স্থিরতা- নিজের সম্পর্কে নিজের জ্ঞান তথা আত্মজ্ঞান। স্বার্থপরতা কে বলেছে খারাপ! প্রকৃত স্বার্থপর হতে পারলে তো পৃথিবীটা শান্তির ভূমি হয়ে যেত। অন্যের তুলনায় দু'টো পয়সা কৌশলে জমিয়ে নেওয়া বা নিজের দু'টো সম্পত্তি বানিয়ে ফেলাটা কি স্বার্থ রক্ষণাবেক্ষণের লক্ষণ!
না, কখনোই না। স্বার্থ বুঝতে গেলে সন্তুষ্টিকে বুঝতে হবে। পরিণামে যদি শান্তি না আসে তাহলে সেই কাজ কি স্বার্থে কাজ! প্রকৃত স্বার্থ বোঝে ক'জন! প্রকৃত স্বার্থ বুঝলে এই পাওয়া- না পাওয়ার চক্করে ব্যক্তি নিজেকে- নিজের শান্তিকে হেলাফেলা করত না। এটা বুঝতো যে, প্রবহমানতাই জীবন। অজানা পথ- অজানা জীবনের প্রশ্নপত্র। অন্তরে রয়েছে সব সমাধানের সূত্র। তাই অন্তরমুখী হবারও প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।
মানুষের বাহ্যিক জগতে যত না সমস্যা রয়েছে, তার তুলনায় অনেক বেশি সমস্যা রয়েছে ব্যক্তির মনোজগতে, তথা মানসিক অবস্থায়। এর জন্য প্রয়োজন সচেতন আত্মসমীক্ষণ। দার্শনিক চেতনা এই আত্মপর্যবেক্ষণে- আত্মসমীক্ষণে সহায়তা করে। শিক্ষাজগতে এই দার্শনিক চেতনার প্রতি যত্নশীল হওয়ার মতো বিষয় পাঠক্রমে অন্তর্ভুক্ত করা আশু প্রয়োজন। প্রাচীন শিক্ষাপাঠক্রমে এই চেতনাকে গুরুত্ব দেওয়া হতো। যা শেখানো হয় তত্ত্বগতভাবে তার প্রায়োগিক ক্ষেত্রের গুরুত্ব কোথায়! প্রয়োগ করতে গেলেই তো পর্যবেক্ষণের- পরীক্ষণের- বিচারবোধ উন্মোচনের জায়গা হবে। তখনই তো শিক্ষা পাবে আসল পূর্ণতা।
তাই শিক্ষাক্ষেত্রে তথা শিক্ষা প্রদানের ব্যাপারে কিছু পরিবর্তন- কিছু সংযোজন আবার প্রয়োজনে কিছু অতীত ঐতিহ্য ফেরানোর প্রয়োজন রয়েছে। শিক্ষা আনে চেতনা আর এই চেতনাই সমস্ত কিছুকে পুনরালোকিত করে। তাই শিক্ষা যথার্থ হওয়া উচিত। পড়ার সময় জানা গেল, জীবন সুখ-দুঃখ মিশিয়ে কিন্তু যখন দুঃখ এলো তখন দিশেহারা হয়ে জীবন- তরীর ভরাডুবির উপক্রম হলে, তা কি ধরনের শিক্ষালাভের পরিচায়ক! শিক্ষা জানালো, এই জড়শরীর নশ্বর অথচ জ্ঞানটি মনমতো নয় বলে এই ধারণা- ভাবনা মেনে নিতে কতই না আপত্তি!
যে সকল বিষয় জীবনের প্রেক্ষাপটে থাকবে সেগুলোর সঠিক স্বরূপ উপলব্ধির প্রয়োজন রয়েছে। এর জন্য প্রয়োজন- মুক্তচিন্তা। শুধু মনাকাঙ্ক্ষিত বিষয় নয়, সাথে সাথে বিষয়ের প্রকৃত জ্ঞানও অর্জন করতে হবে। বিষয়ের সামগ্রিক জ্ঞানলাভে আগ্রহী হতে হবে। যা দার্শনিক জ্ঞানের আলোকে অনেকটাই সম্ভব। তাই জীবনের স্বার্থে, জীবনে চলার পথে দার্শনিক চেতনা খুব প্রয়োজন-
মনে আসুক সুচেতনা,
জীবন হোক্ ভালো।
দর্শনের মননে জীবন-
0 Comments