জ্বলদর্চি

দুটি অণুগল্প/বিজয় চক্রবর্তী

দুটি অণুগল্প

বিজয় চক্রবর্তী 

মা

খবরটা এসেছিল পাশের চা বাগান থেকে। একটা চিতাবাঘ নাকি রোজ সন্ধ্যায় ম্যানেজারের বাংলোর কাছে ঘোরাফেরা করছে। খাঁচা পাতার অর্ডার এল উপর থেকে। বিটবাবু খাঁচা নিয়ে গেলেন, সাথে আমাদের দল। দুদিন পর খবর এল, বাঘ ধরা পড়েছে।

গিয়ে দেখি, খাঁচার ভেতর একটা মাদি চিতা। চোখ দুটোয় রাগ নয়, কেবল আতঙ্ক। বিটবাবু বললেন, "স্যার, এর বাচ্চা আছে মনে হয়। কাল রাতেও গর্জন শুনেছি।" চা বাগানের এক বৃদ্ধ শ্রমিক, শিবুদা, এগিয়ে এলেন। বললেন, "বাবু, ওকে ছাড়ান দ্যান। ও থাকলে শুয়োরের দল বাগানে ঢোকে না। আমাদের ফসল বাঁচে।"

আইনত, ধরা পড়া চিতাবাঘকে জঙ্গলের গভীরে ছেড়ে আসতে হবে। কিন্তু বাচ্চাগুলোর কী হবে? শিবুদার কথাটাও ফেলনা নয়। মানুষ আর বন্যপ্রাণের এই অদ্ভুত সমীকরণ বইয়ের পাতায় থাকে না। আমি শিবুদাকে বললাম, "তোমাদের ভয় করে না?"

শিবুদা হাসলেন, "ভয় তো করে! ও ওর পেটের দায়ে আসে, আমরা আমাদের। মাঝে মাঝে দেখা হয়, এই যা।"

সেদিন রাতে খাঁচাটা আবার বাগানের ধারে নিয়ে যাওয়া হলো। দরজাটা নিঃশব্দে খুলে দিলাম। চিতাবাঘটা এক মুহূর্ত দ্বিধা করে মিলিয়ে গেল অন্ধকারে। পরদিন সকালে শুনলাম, বাগানের শ্রমিকরা মন্দিরের কাছে কয়েকটা কলা আর দুধ রেখে গেছে। বললাম, "একি, বাঘের জন্য?" শিবুদা বললেন, "না বাবু, বনদেবীর জন্য। উনিই তো মা'কে বাচ্চাদের কাছে ফিরিয়ে দিয়েছেন।”


সময়

কলকাতা থেকে এক বড় অফিসার এসেছেন। তার সব কিছু ঘড়ি ধরে। দশটায় লঞ্চ ছাড়বে, এগারোটায় ক্যাম্প পরিদর্শন, একটায় লাঞ্চ। কিন্তু সুন্দরবন তো আর অফিসের ফাইল নয়। সরু খাঁড়িতে ঢুকতেই ভাটার টান শুরু হলো। লঞ্চের তলা কাদায় আটকে গেল।
অফিসারটি রেগে আগুন। ড্রাইভারকে ধমকাচ্ছেন, আমাকে বলছেন শৃঙ্খলার অভাব। আমাদের লঞ্চের চালক, করিম, শুধু মৃদু হাসল। বলল, "স্যার, এখানে শুধু জোয়ার-ভাটার ঘড়ি চলে। এখন ছ'ঘণ্টা অপেক্ষা।"
সেই ছ'ঘণ্টায় অফিসারটি লঞ্চের ডেকে বসে রইলেন। দেখলেন মাছরাঙা পাখির ডাইভ, দেখলেন একটা গোসাপ সাঁতরে খাঁড়ি পার হচ্ছে, দেখলেন mangrover উপর সূর্যের আলোর পরিবর্তন। যখন আবার জোয়ার এল আর লঞ্চটা ভেসে উঠল, তখন তিনি একদম চুপ। বাকি সফরে তিনি আর একবারও তার ঘড়ির দিকে তাকাননি!

🍂

Post a Comment

0 Comments