দেবার্ঘ্য ঘোষ
লেখালেখি মানুষের এক অনন্য এবং প্রাচীনতম আত্মপ্রকাশের মাধ্যম। সৃষ্টির আদি লগ্ন থেকেই মানুষ নিজের অনুভূতি, অভিজ্ঞতা, আনন্দ ও বেদনাকে অন্যের কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্য কোনো না কোনো উপায় খুঁজেছে। যখন থেকে মানুষ ভাষা এবং লিপির ব্যবহার শিখেছে, তখন থেকেই তার মনের ভেতরের অব্যক্ত কথাগুলো কাগজের বুকে ঠাঁই পেতে শুরু করেছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো—মানুষ কেন লেখে? এই লেখার পেছনে কী এমন তাগিদ থাকে, যা একজন মানুষকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কলম ও কাগজ অথবা কিবোর্ডের সামনে বসিয়ে রাখে?'কেন লিখি' - এই প্রশ্নটি শুধু একজন পেশাদার লেখকের নয়, বরং যেকোনো মানুষের ভেতরের সত্ত্বাকে জাগ্রত করার মতো একটি মৌলিক প্রশ্ন। বিখ্যাত সাহিত্যিক জর্জ অরওয়েল তাঁর একটি বিখ্যাত প্রবন্ধে লেখক হওয়ার পেছনে মূলত চারটি প্রধান কারণ উল্লেখ করেছিলেন: তীব্র অহংবোধ, নান্দনিক উৎসাহ, ঐতিহাসিক তাগিদ এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্য। তবে ব্যক্তিগত এবং সামাজিক জায়গা থেকে এই লেখার কারণগুলো আরও অনেক গভীর এবং বিস্তৃত। মানুষ মূলত নিজের অস্তিত্বের জানান দিতে, সমাজের অসংগতি তুলে ধরতে এবং মনের শান্তি খুঁজতে লেখার আশ্রয় নেয়।
লেখার সবচেয়ে প্রথম এবং প্রধান কারণ হলো নিজের ভেতরের সত্ত্বার সাথে পরিচিত হওয়া। প্রতিদিন আমাদের মাথায় হাজার হাজার চিন্তা ঘুরপাক খায়। এর অনেকগুলোই বিশৃঙ্খল। যখন আমরা লিখতে বসি, তখন এই বিশৃঙ্খল চিন্তাগুলো একটি নির্দিষ্ট কাঠামো পায়। লিখতে গিয়ে মানুষ নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করে। অনেক সময় এমন কিছু অনুভূতি থাকে যা মুখে বলা যায় না। তীব্র দুঃখ, লুকানো আনন্দ কিংবা একাকিত্বের মতো অনুভূতিগুলো মানুষ ডায়েরির পাতায় বা গল্পের ছলে ফুটিয়ে তোলে। মনোবিজ্ঞানে 'ক্যাথারসিস' বা মনের আবেগ মুক্ত করার একটি বড় মাধ্যম হলো লেখালেখি। মনের ভেতর জমে থাকা ক্ষোভ, কষ্ট বা হতাশা যখন কাগজের বুকে শব্দের আকারে নেমে আসে, তখন মন অনেকটাই হালকা হয়ে যায়।কিন্তু তার সৃষ্টি অমর। 'আমি ছিলাম, আমি ভেবেছিলাম, আমি অনুভব করেছিলাম'—এই সত্যটুকুকে পৃথিবীর বুকে চিরস্থায়ী করে রাখার জন্যই মানুষ লেখে। লিখনী হলো সময়ের বুকে নিজের পায়ের ছাপ রেখে যাওয়ার লড়াই। সাহিত্য বা লেখালেখি কেবল নিজের আনন্দের জন্য নয়, এটি সমাজের দর্পণ। একজন সচেতন মানুষ হিসেবে আমরা যখন আমাদের চারপাশে অন্যায়, অবিচার, বৈষম্য বা কুসংস্কার দেখি, তখন আমাদের বিবেক তাড়িত হয়। সবাই হয়তো রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ করতে পারে না, কিন্তু একজন লেখক তাঁর কলমকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেন।
"তরবারি নয়, কলমই হোক অন্যায়ের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় হাতিয়ার।"
ইতিহাস সাক্ষী, বড় বড় বিপ্লবের পেছনে কোনো না কোনো লেখকের লেখার বড় ভূমিকা ছিল। ফরাসি বিপ্লব থেকে শুরু করে আমাদের বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধ, বখানেই কবি, সাহিত্যিক ও সাংবাদিকদের লেখা সাধারণ মানুষকে অনুপ্রাণিত করেছিল। যখন সমাজ স্থবির হয়ে পড়ে, যখন মানুষের মুখ বন্ধ করে দেওয়া হয়, তখন লেখকের কলম হয়ে ওঠে শোষিতের কণ্ঠস্বর। চারপাশের অসংগতি, সাধারণ মানুষের দুঃখ-দুর্দশা এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতেই মানুষ লিখতে বাধ্য হয়।মানুষের একটি সহজাত প্রবৃত্তি হলো সুন্দর কিছু সৃষ্টি করা। একজন চিত্রশিল্পী যেমন রং-তুলি দিয়ে ক্যানভাসে ছবি আঁকেন, একজন লেখক ঠিক তেমনি শব্দ দিয়ে ছবি আঁকেন। এই সৃষ্টির আনন্দ অপরিসীম।একটি নতুন গল্প, একটি সুন্দর কবিতা বা একটি চমৎকার প্রবন্ধ তৈরি করার পর যে মানসিক তৃপ্তি পাওয়া যায়, তা অন্য কোনো কিছুর সাথে তুলনা করা যায় না। শব্দের পর শব্দ বসিয়ে একটি সম্পূর্ণ নতুন জগৎ তৈরি করা, নতুন কিছু চরিত্র সৃষ্টি করা এবং তাদের জীবনের সুখ-দুঃখ নিয়ন্ত্রণ করার মধ্যে এক ধরণের ঐশ্বরিক আনন্দ রয়েছে। এই নান্দনিক ভালো লাগা এবং শিল্প সৃষ্টির তীব্র আকাঙ্ক্ষা মানুষকে লেখার টেবিলে টেনে আনে।
মানুষ কেন লেখে তার আরেকটি বড় উত্তর হলো আগামী প্রজন্মের জন্য জ্ঞান ও ইতিহাসকে টিকিয়ে রাখা। আজ আমরা হাজার বছর আগের মানুষের জীবনযাত্রা, তাদের সংস্কৃতি, বিজ্ঞান ও দর্শন সম্পর্কে জানতে পারছি কারণ তারা তা লিখে রেখে গিয়েছিলেন।একজন মানুষ তার জীবনে যা কিছু শেখে, যে সমস্ত ভুল করে বা যে জ্ঞান অর্জন করে, তা যদি সে লিখে না যায় তবে তার মৃত্যুর সাথে সাথে সেই জ্ঞানও হারিয়ে যায়।সমসাময়িক সময়ের রাজনীতি, অর্থনীতি এবং মানুষের জীবনযাত্রার সঠিক চিত্র ধরে রাখার জন্য লেখালেখি অপরিহার্য। আজকের লেখা আগামী দিনের গবেষকদের জন্য ইতিহাসের এক একটি মূল্যবান উপাদান। তাই সময়কে ফ্রেমবন্দী করার তাগিদেই মানুষ লিখে থাকে।মানুষ সামাজিক জীব। সে সবসময় অন্যের সাথে যুক্ত হতে চায়। লেখালেখি হলো স্থান ও কালের সীমানা পেরিয়ে মানুষের সাথে যোগাযোগ করার একটি জাদুকরী মাধ্যম।আজ আমি যে লেখাটি লিখছি, তা হয়তো পৃথিবীর অন্য প্রান্তের একজন মানুষ পড়বে। সে হয়তো লেখকের ভাষাভাষী নাও হতে পারে (অনবাদের মাধ্যমে), কিন্তু লেখকের অনুভূতিটা সে ঠিকই স্পর্শ করতে পারবে। যখন কোনো পাঠক একটি বই পড়ে বলে ওঠেন, "আরে! এই ঠিক এই কথাটিই তো আমিও ভাবছিলাম, কিন্তু প্রকাশ করতে পারিনি!"- তখনই একজন লেখকের সার্থকতা। এই যে মানুষের মনের সাথে মনের সেতু বন্ধন তৈরি করা, একে অপরের প্রতি সহমর্মিতা প্রকাশ করা, এটাই লেখার অন্যতম বড় অনুপ্রেরণা।
সবশেষে, বাস্তবতার নিরিখেও লেখার একটি বড় কারণ রয়েছে। অনেকের কাছে লেখালেখি কেবল শখ বা মনের খোরাক নয়, এটি জীবনধারণের মাধ্যম বা পেশা।আজকের দিনে সাংবাদিকতা, কনটেন্ট রাইটিং, কপিরাইটিং, চিত্রনাট্য লেখা এবং বই প্রকাশের মতো বহু পেশা তৈরি হয়েছে যা সম্পূর্ণভাবে লেখার দক্ষতার ওপর নির্ভরশীল। অনেকে নিজের জীবিকা নির্বাহের জন্য, নিজের জ্ঞানকে পেশাগত রূপ দেওয়ার জন্য নিয়মিত লিখে থাকেন। তবে পেশাগত কারণে লিখলেও, ভেতরে যদি লেখার প্রতি সত্যিকারের ভালোবাসা না থাকে, তবে সেই লেখা কখনো দীর্ঘস্থায়ী বা মানসম্মত হতে পারে না। পরিশেষে বলা যায়, মানুষ কেন লেখে, এই প্রশ্নের কোনো একটি নির্দিষ্ট উত্তর নেই। এটি একেক জনের কাছে একেক রকম। কারও কাছে এটি মনের শান্তি খোঁজার উপায়, কারও কাছে অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের হাতিয়ার, আবার কারও কাছে এটি কেবলই জীবিকা বা শিল্পচর্চা।তবে কারণ যা-ই হোক না কেন, লেখালেখি মানুষকে আরও বেশি সংবেদনশীল, বিবেকবান এবং মানুষ হিসেবে পূর্ণাঙ্গ করে তোলে। কলমের কালির প্রতিটি ফোঁটা যখন কাগজের পাতায় পড়ে, তখন একটি নতুন চিন্তার জন্ম হয়, যা সমাজকে বদলে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে। যতদিন মানুষের মনে অনুভূতি থাকবে, যতদিন সমাজে অন্যায় থাকবে এবং যতদিন মানুষ নিজেকে প্রকাশ করতে চাইবে, ততদিন মানুষ লিখে যাবে। লেখার এই ধারা অনন্ত, এর কোনো শেষ নেই।
1 Comments
প্রিয় দেবার্ঘ্য,
ReplyDeleteতোমার ছবিটি দেখে মনে হলো, তুমি আমার সন্তানতুল্য। আমার দুই ছেলের নামও 'দেব' দিয়ে শুরু—তুমি আরেক দেব।
তোমার 'কেন লিখি' প্রবন্ধটি পড়লাম। ভীষণ ভালো লাগল। প্রবন্ধ হিসেবে এটি সত্যিই অত্যন্ত প্রশংসনীয়। মানুষ কেন লেখে, তার যত রকম কারণ হতে পারে, সেগুলো তুমি খুব সুন্দর, সুসংহত ও সুচারুভাবে তুলে ধরেছ।
ঋত্বিকবাবু যদি তোমার লেখাটা আগে পোস্ট করতেন, তাহলে আমরা সবাই বোধহয় এমসিকিউ পরীক্ষার মতো নিজের নিজের সঠিক অপশনটা বেছে নিতে পারতাম!
তবে তোমার কাছে একটা ছোট্ট আবদার রইল। এখনও পর্যন্ত যতগুলো 'কেন লিখি' পড়েছি, তার বেশিরভাগই আমাদের পুরোনো প্রজন্মের লেখকদের। তোমরা তো Gen Z-এর প্রতিনিধি। তাই জানতে খুব ইচ্ছে করছে—তোমার লেখালিখি কেন ভালো লাগে? কী এমন টান তোমাকে বারবার কলমের কাছে ফিরিয়ে আনে? সময় করে অবশ্যই লিখে পাঠিও।
অনেক ভালোবাসা আর আশীর্বাদ রইল। ভালো থেকো।