জ্বলদর্চি

হোলি/ কমলিকা ভট্টাচার্য

হোলি 
কমলিকা ভট্টাচার্য

রঙের নীহারিকা
    

হোলির দিন
আকাশটা যেন এক বিশাল প্যালেট—
ঈশ্বর নিজেই তুলিতে মেখে
মানুষের কপালে আঁকেন ভোর।

আমার ভেতরেও এক গোপন গ্যালাক্সি,
যেখানে লাল মানে শুধু রক্ত নয়—
অপরাধবোধের পরে জন্ম নেওয়া ক্ষমা,
সবুজ মানে শুধু পাতা নয়—
বারবার ভেঙে গিয়েও আবার জন্মানো ইচ্ছে।
ধূসর গুলাল উড়ে আসে—
ঈর্ষার ধূমকেতু হয়ে,
কিন্তু আমার আত্মা এক কৃষ্ণগহ্বর নয়
যে সব আলো টেনে নেবে নিঃশেষে।

আমি আলোকে ফিরিয়ে দিই—
রঙিন বিস্ফোরণে।
হোলি তাই আমার কাছে
অন্তর্গত নীহারিকার বিস্তার,
যেখানে অন্ধকারও
আলোর জন্মদাত্রী মাত্র।


মনের ক্যানভাসে জলরং

মনটা আজ জলরঙে ভেজা কাগজ,
এক ফোঁটা ভালোবাসা পড়লেই
ছড়িয়ে পড়ে অনন্তে।

তোমার ছোঁয়া যেন নীলের দীর্ঘশ্বাস,
আমার নিঃশ্বাসে গোলাপি অনুশোচনা,
হলুদের মতো জেগে ওঠে শৈশবের উঠোন।

কেউ কেউ ধূসর গুলাল ছুঁড়ে দেয়,
শব্দহীন অপমানের মতো।
কিন্তু জলরঙের এক অদ্ভুত ধর্ম আছে,
অন্ধকার তাকে গাঢ় করে,
মুছে দেয় না।
আমি তাই কালোকে ভয় পাই না—
তাকে মিশিয়ে নিই বেগুনির গভীরে,
তৈরি করি সন্ধ্যা।

সেই সন্ধ্যায়
চাঁদের নৌকো ভাসে নীরব আকাশে,
আমরা দু’জন শব্দহীন যাত্রী—
রঙ মুছে গিয়ে থাকে শুধু আলো,
আর আলোর ভিতর
ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়ে ওঠে
আমাদেরই অবয়ব।
ভালোবাসার রসায়ন

হোলি আসলে এক রসায়নশাস্ত্র
দু’টি আলাদা সত্তা
স্পর্শের বিক্রিয়ায়
তৃতীয় এক রং হয়ে ওঠে।

তোমার অভিমান ছিল গাঢ় নীল,
আমার নীরবতা ছিল ধূসর,
দু’জনের মিলনে জন্ম নিল
অদ্ভুত এক বেগুনি—
যার নাম ক্ষমা।

যখন হিংসার কালি
আঙুলে মেখে কেউ ছুঁতে চায় আমাদের,
যখন সন্দেহের ছায়া
হঠাৎ ঢেকে দেয় রৌদ্রের দিকচিহ্ন,
তখন বুঝি,
ভেতরের আগ্নেয়গিরি এখনো নিভে যায়নি।
লাভা আছে বলেই
মাটি এত উষ্ণ,
ধোঁয়া ওঠে বলেই
আকাশ খুঁজে ফেরে বৃষ্টি।

হোলির আসল রং তাই
মুঠোভরা আবিরে নয়—
অন্তর্গত পরীক্ষাগারে,
যেখানে ক্ষতও উপাদান,
অভিমানও অনুঘটক।
ভালোবাসা সেখানে
নিজেকে ভাঙে, গলে, বদলে ফেলে
এক নতুন যৌগের জন্ম দেয়,
যার নির্দিষ্ট কোনো নাম নেই,
শুধু এক ধরনের উষ্ণতা আছে।

আর সেই উষ্ণতাই
আমাদের প্রকৃত রং।


 গোপন হোলি

আমার মন কোনো শহর নয় আজ
সে এক গোপন মহাবিশ্ব,
যেখানে আলো জন্মায় অন্ধকারের গর্ভে।

হোলির দিন সেখানে সূর্য ওঠে না,
উঠে এক অদৃশ্য স্পর্শ—
তোমার।

তুমি কখনো প্রকাশ্য নও,
তুমি আবিরের মতো—
আঙুলের ফাঁক গলে উড়ে যাও,
তবু রয়ে যাও শ্বাসে।

লাল আজ শুধু প্রতিবাদ নয়—
সে আমাদের অস্বীকৃত চুম্বনের উষ্ণতা,
সবুজ শুধু পুনর্জন্ম নয়—
সে তোমার চোখের ভেতর
আমার জন্য লুকোনো বসন্ত।

নীল আসে গভীর গোপনীয়তার মতো—
অসীম আকাশে ছড়িয়ে থাকা
দুজন মানুষের নীরব শপথ।
আর কালো?
কালো আমাদের আশ্রয়।
রাতের মতো,
যেখানে কেউ দেখে না—
শুধু অনুভব করি আমরা।

তুমি জানো?
রামধনু কখনো দিনের সম্পত্তি নয়,
তার জন্ম বৃষ্টির অশ্রুতে,
তার শরীর আলো আর অন্ধকারের গোপন সমঝোতা।

আমাদের প্রেমও তেমন—
প্রকাশে নিষিদ্ধ,
অপ্রকাশে অনন্ত।

হোলি মানে তাই রং খেলা নয়—
হোলি মানে
তোমার নাম না উচ্চারণ করেও
তোমার রঙে ভিজে থাকা।

অন্ধকারকে মুছে ফেলা নয়,
তাকে আলিঙ্গন করে
তার বুকে রামধনু এঁকে দেওয়া।
কারণ গোপনপ্রেম জানে—
সবচেয়ে উজ্জ্বল রং
সবসময় আলোতে জন্মায় না,
কখনো কখনো
দু’টি আত্মার মাঝের অদৃশ্য ছায়াতেই
তার দীপ্তি।

গোধূলির হোলি 

মানুষের ভেতরে এক অনন্ত গোধূলি থাকে—
না সম্পূর্ণ দিন,
না সম্পূর্ণ রাত।

সেই গোধূলির নামই হয়তো প্রেম,
যেখানে আলো অন্ধকারকে প্রত্যাখ্যান করে না,
বরং তাকে আশ্রয় দেয়।

হোলি আসে প্রতি বছর—
কিন্তু রং তো ক্যালেন্ডার মানে না।
রং জন্মায় যখন
অস্বীকার স্বীকারে রূপ নেয়,
যখন ভাঙন থেকে জন্ম নেয় বিস্তার।

লাল তখন আর প্রতিবাদ নয়—
সে হৃদস্পন্দনের সম্মিলিত ছন্দ,
যা সকল প্রাণের ভেতর সমানভাবে ধ্বনিত।
সবুজ হয়ে ওঠে সম্ভাবনার প্রতিশ্রুতি—
যে প্রতিশ্রুতি মানুষকে
নিজের সীমা পেরোতে শেখায়।

নীল অসীমতার মতো
সব বিভাজন গিলে নেয়—
জাতি, ভাষা, দূরত্ব, নাম
তাই তো রোজ আকাশ খেলে 
গোধূলিতে হোলি।

Post a Comment

4 Comments

  1. খুব সুন্দর

    ReplyDelete
  2. 💚❤️❤️🩵🧡💙💛💜

    ReplyDelete
  3. হোলি সংক্রান্ত প্রত্যেকটা কবিতা সুন্দর। "মনের ক্যানভাসে জলরঙ" সত্যি মনে দাগ কেটে যায়। অপূর্ব!!

    ReplyDelete