জ্বলদর্চি

কেন লিখি/ আগমনী কর মিশ্র


কেন লিখি
আগমনী কর মিশ্র

মানুষের মনের গভীরে এমন কিছু অনুভূতি, স্বপ্ন, কষ্ট ও আনন্দ লুকিয়ে থাকে, যা সবসময় মুখে প্রকাশ করা যায় না। সেই অব্যক্ত অনুভূতির সবচেয়ে সুন্দর আশ্রয় হলো লেখা। কেউ গান গেয়ে নিজের মনের কথা বলে, কেউ ছবি এঁকে নিজের ভাবনা প্রকাশ করে, আবার কেউ কলমের কালি দিয়ে নিজের আত্মাকে ছুঁয়ে যায়। আমি সেই শেষের পথটিই বেছে নিয়েছি। তাই আমার কাছে লেখালিখি কোনো শখ নয়, কোনো সময় কাটানোর মাধ্যমও নয়; এটি আমার আত্মপ্রকাশের সবচেয়ে প্রিয় উপায়।
আমি লেখালিখি করি, কারণ শব্দের মধ্যে আমি আমার নিজের পৃথিবী খুঁজে পাই। জীবনের প্রতিটি ছোটো ঘটনা, মানুষের হাসি-কান্না, প্রকৃতির রূপ, সমাজের বৈপরীত্য কিংবা নিজের একাকিত্ব—সবকিছুই আমার কাছে এক একটি গল্প, এক একটি কবিতা। যখন কোনো দৃশ্য আমাকে গভীরভাবে স্পর্শ করে, তখন মনে হয় সেটিকে শুধু দেখে চলে গেলে অন্যায় হবে। তাকে শব্দের মাধ্যমে ধরে রাখতে হবে, যাতে সেই মুহূর্তটি সময়ের স্রোতে হারিয়ে না যায়।
লেখালিখি আমাকে মানসিক শান্তি দেয়। এমন অনেক অনুভূতি থাকে, যা কাউকে বলা যায় না,বা বলে বোঝানো যায় না। কিন্তু কাগজ কখনো বিচার করে না, কলম কখনো প্রশ্ন করে না। তাই মন যখন ভারাক্রান্ত হয়, তখন আমি লিখি। আবার মন যখন আনন্দে ভরে ওঠে, তখনও লিখি। আমার কাছে লেখা যেন এক বিশ্বস্ত বন্ধুর মতো, যে নীরবে আমার সমস্ত কথা শুনে যায়।
আমি বিশ্বাস করি, একটি ভালো লেখা মানুষের মনকে স্পর্শ করতে পারে। একটি কবিতা মানুষকে নতুন করে ভাবতে শেখাতে পারে, একটি গল্প সমাজের অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের ভাষা হয়ে উঠতে পারে, একটি প্রবন্ধ মানুষকে সত্যের পথে চলতে অনুপ্রাণিত করতে পারে। তাই লেখালিখি আমার কাছে শুধু ব্যক্তিগত অনুভূতির প্রকাশ নয়; এটি সমাজের প্রতি আমার দায়বদ্ধতারও একটি অংশ।
আমার লেখার অন্যতম উৎস হলো প্রকৃতি। বর্ষার বৃষ্টিধারা, শরতের সাদা কাশফুল, হেমন্তের শিশির, বসন্তের কোকিলের ডাক কিংবা সন্ধ্যার শেষ আলো—সবকিছুই আমাকে নতুন করে লিখতে শেখায়। প্রকৃতির প্রতিটি রূপ যেন আমার কাছে এক একটি অপ্রকাশিত কবিতা, যার ভাষা আমি খুঁজে ফিরি।  প্রকৃতির দিকে তাকালেই মনে হয় সে আমার সঙ্গে কথা বলে। আমি তার কথাগুলো কেবল লিখে ফেলি।মানুষের জীবনও আমার লেখার বড় অনুপ্রেরণা। পথে দেখা কোনো শ্রমিকের ক্লান্ত মুখ, কোনো বৃদ্ধের নিঃসঙ্গতা, কোনো শিশুর নিষ্পাপ হাসি কিংবা কোনো মায়ের নিঃস্বার্থ ভালোবাসা—এসবই আমাকে ভাবায়। আমি মনে করি, একজন লেখকের কাজ শুধু সুন্দর দৃশ্যের বর্ণনা দেওয়া নয়; মানুষের সুখ-দুঃখ, আশা-নিরাশা ও সংগ্রামের কথাও তুলে ধরা। কারণ সাহিত্য তখনই অর্থবহ হয়, যখন তা মানুষের জীবনের সঙ্গে মিশে যায়।
লেখালিখি আমাকে ধৈর্য, পর্যবেক্ষণ ও সংবেদনশীলতা শিখিয়েছে। আগে হয়তো অনেক কিছুই চোখের সামনে ঘটত, কিন্তু আমি গভীরভাবে উপলব্ধি করতাম না। এখন প্রতিটি ঘটনা আমাকে ভাবায়। আমি মানুষের কথা মন দিয়ে শুনি, চারপাশের পরিবেশকে অনুভব করি এবং প্রতিটি অভিজ্ঞতা থেকে নতুন কিছু শেখার চেষ্টা করি। এই শেখার মধ্যেই একজন লেখকের প্রকৃত বিকাশ ঘটে।
অনেকেই মনে করেন, লেখালিখি সহজ কাজ। কিন্তু বাস্তবে একটি ভালো লেখা সৃষ্টি করতে হলে নিয়মিত পড়াশোনা, চিন্তাভাবনা ও অধ্যবসায়ের প্রয়োজন হয়। অনেক সময় একটি মাত্র বাক্য লিখতেও দীর্ঘ সময় লেগে যায়। তবুও আমি লিখে চলি, কারণ আমি জানি, প্রতিটি লেখা আমাকে আরও পরিণত করে, আরও সমৃদ্ধ করে। প্রতিটি ব্যর্থ প্রচেষ্টা পরবর্তী সফল লেখার ভিত্তি তৈরি করে।
আমার লেখালিখির পেছনে বাংলা সাহিত্যের মহান সাহিত্যিকদের অবদানও অপরিসীম। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, জীবনানন্দ দাশ, শক্তি চট্টোপাধ্যায়সহ অসংখ্য সাহিত্যিকের সৃষ্টি আমাকে নতুন করে ভাবতে শিখিয়েছে। তাঁদের লেখায় আমি ভাষার সৌন্দর্য, মানবতার শিক্ষা এবং জীবনের গভীর সত্যকে আবিষ্কার করেছি। তাঁদের পথ অনুসরণ করেই আমিও শব্দের ভুবনে নিজের অনুভূতির ইমারত গড়ে তুলতে চাই।
আমি জানি, হয়তো আমার লেখা কোনদিন বিশ্বজোড়া খ্যাতি পাবে না। কিন্তু যদি আমার কোনো একটি কবিতা একজন মানুষের চোখে আনন্দের অশ্রু এনে দেয়, যদি কোনো গল্প কাউকে নতুন করে স্বপ্ন দেখতে শেখায়, কিংবা কোনো প্রবন্ধ একজন পাঠকের চিন্তার জগতে সামান্য আলো জ্বালাতে পারে, তাহলেই আমার লেখালিখি সার্থক হবে। একজন লেখকের প্রকৃত সাফল্য পুরস্কারে নয়; পাঠকের হৃদয়ে জায়গা করে নেওয়াতেই।
সবশেষে বলতে চাই, লেখালিখি আমার কাছে জীবনেরই আরেকটি নাম। এটি আমাকে বাঁচতে শেখায়, অনুভব করতে শেখায় এবং মানুষকে ভালোবাসতে শেখায়। কলম হাতে নিলে আমি যেন নিজের সঙ্গে কথা বলতে পারি, নিজের সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করতে পারি। তাই আমি লিখি—নিজেকে জানার জন্য, মানুষকে জানার জন্য, সমাজকে কিছু দেওয়ার জন্য এবং আগামী দিনের কাছে আমার সময়ের গল্প রেখে যাওয়ার জন্য। যতদিন অনুভব করার ক্ষমতা থাকবে, ততদিন আমার কলম চলবে। কারণ লেখালিখিই আমার আত্মার সবচেয়ে সুন্দর ভাষা।
                 
🍂

Post a Comment

6 Comments

  1. কমলিকাJuly 08, 2026

    একদম ঠিক বলেছো।

    ReplyDelete
    Replies
    1. AnonymousJuly 08, 2026

      ভালোলাগা অনেক।

      Delete
  2. AnonymousJuly 08, 2026

    কিন্তু আপনাকে তো চিনিই না! কোথায় লেখেন আপনি?

    ReplyDelete
    Replies
    1. AnonymousJuly 08, 2026

      সবাইকে না চিনলেও চলবে সুজন।

      Delete
  3. AnonymousJuly 08, 2026

    খুব সুন্দর কথা

    ReplyDelete
    Replies
    1. AnonymousJuly 08, 2026

      ধন্যবাদ।

      Delete